প্রদীপ কুমার রায়, বিশেষ প্রতিনিধি:
শরতের শেষভাগ পেরিয়ে হেমন্তের আবহে প্রকৃতিতে লেগেছে নতুন রঙের ছোঁয়া। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটেছে অসংখ্য ছোট ছোট বরই ফুল। কোনো গাছের ডাল ভরে আছে সাদা-হলদে ফুলে, আবার কোনো গাছে ফুলের সমারোহে দূর থেকেই চোখ আটকে যায়। ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণে ছুটে আসছে মৌমাছি। গাছের ডালে ডালে তাদের গুঞ্জন আর ফুলের সৌন্দর্য মিলিয়ে গ্রামীণ জনপদে সৃষ্টি হয়েছে এক মনোরম দৃশ্যের। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও বসতবাড়ির আঙিনায় এখন বরই ফুলের এমনই অপরূপ সমারোহ।
প্রকৃতির এই স্নিগ্ধ রূপ শুধু চোখের প্রশান্তিই বাড়াচ্ছে না, জাগিয়ে তুলছে নতুন ফলনের প্রত্যাশাও। গাছভরা ফুল দেখে গৃহস্থের মনে উঁকি দিচ্ছে মিষ্টি-টক বরইয়ের স্বাদ আর বাড়তি আয়ের স্বপ্ন। ফুল ঝরে গাছে গাছে ফল ধরলে কয়েক মাস পর এসব গাছেই দেখা মিলবে সবুজ ও হলদে-বাদামি বরইয়ের। তখন শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সের মানুষের কাছে বাড়ির আঙিনার বরইগাছ হয়ে উঠবে আকর্ষণের কেন্দ্র।
গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই বরই ফুলের সৌন্দর্য
সরেজমিনে উপজেলার গাইয়ার চর, চরবংশী, হায়দরগঞ্জ, কেরোয়া, চরপাতা, দেবীপুর, চরমোহনা, কাজির চর, উদমারা ও সোনাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বরইগাছে ফুলের উপস্থিতি দেখা যায়। কোথাও বাড়ির উঠানে, কোথাও বসতঘেঁষা জমিতে, আবার কোথাও বাগানের সারি সারি গাছে ফুটেছে ফুল। গ্রামীণ পরিবেশে এসব গাছ যেন প্রকৃতির নিজস্ব সাজে সেজেছে।
বরই ফুল আকারে ছোট হলেও গাছের ডালপালাজুড়ে ফুটলে তা আলাদা সৌন্দর্য তৈরি করে। সবুজ পাতার আড়ালে ফুটে থাকা ফুলগুলো কাছে থেকে দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি ফুলের ঘ্রাণ ও মৌমাছির আনাগোনা প্রকৃতিতে যোগ করেছে বাড়তি প্রাণচাঞ্চল্য। গাছের গোড়ায় কিংবা ডালপালার আশপাশে পিঁপড়ার চলাচলও চোখে পড়ে।
রায়পুরে দেশি বরইয়ের পাশাপাশি কাশ্মীরি কুল ও আপেল কুলের চাষও রয়েছে। জাতভেদে ফলের আকার, স্বাদ ও বাজারমূল্যে পার্থক্য দেখা যায়। ফলে বসতবাড়ির প্রচলিত ফলগাছের পাশাপাশি বরই এখন অনেকের কাছে বাণিজ্যিকভাবে চাষেরও সম্ভাবনাময় একটি ফল।
বাড়ির আঙিনার গাছেও আয়ের সম্ভাবনা
উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামের বাসিন্দা নুর মিয়ার বাড়ির আঙিনায় রয়েছে তিনটি দেশি বরইগাছ। পরিবারের দৈনন্দিন পরিবেশে ছায়া ও সৌন্দর্য দেওয়ার পাশাপাশি গাছগুলো থেকে ফল পাওয়ার প্রত্যাশা করেন তিনি। একই গ্রামের জহির হোসেনের পৌর শহরের বাড়ির ছাদেও রয়েছে একটি বরইগাছ। সীমিত জায়গায় গাছ লাগিয়ে ফল পাওয়ার এমন উদ্যোগ বাড়ির আঙিনায় ফলচাষের সম্ভাবনাকে তুলে ধরে।
গাইয়ার চরের বাসিন্দা মানিক মজুমদার বলেন, “আমার দুটি বরইগাছ রয়েছে। প্রতি বছর এসব গাছের বরই বিক্রি করে প্রায় তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় করতে পারি।”
তার অভিজ্ঞতা বলছে, বড় কোনো বাগান না থাকলেও বাড়ির আঙিনায় থাকা কয়েকটি ফলগাছ থেকে পরিবারের জন্য ফল পাওয়ার পাশাপাশি কিছু বাড়তি আয় করা সম্ভব। তবে ফলন, ফলের মান ও বাজারদরের ওপর এ আয় নির্ভর করে।
কম খরচে চাষ, পরিচর্যায় মিলতে পারে ভালো ফলন
বরই বাংলাদেশের পরিচিত ও জনপ্রিয় ফলগুলোর একটি। স্থানীয়ভাবে কুল নামেও পরিচিত এই ফলের রয়েছে নানা জাত। টক-মিষ্টি স্বাদের কারণে কাঁচা বরইয়ের চাহিদা যেমন রয়েছে, তেমনি পাকা বরইও অনেকের প্রিয়। মৌসুমে বাজারে বরই ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাদের মধ্যে এ ফল কেনার আগ্রহ দেখা যায়।
বরইগাছ তুলনামূলকভাবে সহজে চাষ করা যায়। উপযুক্ত মাটি, পর্যাপ্ত আলো, প্রয়োজনীয় পানি ও নিয়মিত পরিচর্যা পেলে গাছ ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। তবে ভালো ফলন পেতে রোগবালাই পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজন অনুযায়ী ছাঁটাই এবং সুষম সার ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। ফুল আসার সময় গাছের পরিচর্যা ও অনুকূল আবহাওয়াও ফলনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
রায়পুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মাজেদুল ইসলাম বলেন, “বরই চাষে তুলনামূলক খরচ কম। কম খরচে অধিক লাভবান হওয়া যায়। পতিত জমিতে বরইগাছ লাগিয়ে বাড়তি আয় করা সম্ভব।”
কৃষি বিভাগের এ পরামর্শ অনুযায়ী, বাড়ির অব্যবহৃত জায়গা, বসতবাড়ির সীমানা কিংবা উপযুক্ত পতিত জমিতে পরিকল্পিতভাবে বরইগাছ লাগানো যেতে পারে। তবে বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তোলার আগে জাত নির্বাচন, জমির উপযোগিতা, বাজারের চাহিদা ও পরিচর্যার ব্যয় সম্পর্কে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ফুল থেকে ফল—অপেক্ষা এখন নতুন মৌসুমের
বরইগাছে ফুল আসার পর ধীরে ধীরে ফল গঠন শুরু হয়। জাত ও আবহাওয়াভেদে ফল পাকার সময়ের তারতম্য ঘটে। সাধারণত শীতের মৌসুমে বরই বাজারে বেশি পাওয়া যায়। কাঁচা অবস্থায় সবুজ আর পাকতে শুরু করলে হলদে বা বাদামি আভা ধারণ করা বরইয়ের স্বাদ নিতে অপেক্ষায় থাকেন ফলপ্রেমীরা।
একসময় বরইগাছ ছিল গ্রামীণ বসতবাড়ির পরিচিত অনুষঙ্গ। বাড়ির পাশে কিংবা পুকুরপাড়ে থাকা একটি গাছ থেকেই পরিবারের সদস্যদের বরইয়ের চাহিদা মিটত। এখন দেশি জাতের পাশাপাশি উন্নত জাতের কুল চাষের আগ্রহও বাড়ছে। সঠিক পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণের সুযোগ থাকলে এই ফল অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের উৎস হতে পারে।
বরই ফুলের এই মৌসুমি সৌন্দর্য তাই কেবল প্রকৃতির সাজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের প্রত্যাশা, গৃহস্থের আনন্দ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে সম্ভাবনার গল্প। ফুল ঝরে ফল ধরবে, ডালপালা নুয়ে পড়বে বরইয়ের ভারে—এমন প্রত্যাশায় দিন গুনছেন গাছের মালিকেরা।
সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে থাকা ছোট ছোট ফুলগুলো যেন আগাম বার্তা দিচ্ছে নতুন ফলনের। এখন রায়পুরের গ্রামগুলোতে বরই ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণে প্রকৃতি সেজেছে নবরূপে। কয়েক মাস পর সেই ফুলের জায়গা দখল করবে টক-মিষ্টি বরই। প্রকৃতির এই চক্রের সঙ্গে মিশে থাকবে মানুষের আনন্দ, স্বাদ আর বাড়তি আয়ের স্বপ্ন।
প্রকাশক: মো: জহির হোসাইন সম্পাদক: প্রদীপ কুমার রায়
আইন বিষয়ক উপদেষ্টা: এড. মোঃ আনোয়ার হোসেন
কার্যালয়: চায়না টাউন, ৫ তলা, নয়াপল্টন ঢাকা
কার্যালয়: গাজী কমপ্লেক্স, ৩য় তলা, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর
www.deshdiganta.com