প্রদীপ কুমার রায় :
গতকালই একটি পোস্টে উল্লেখ করেছিলাম—জামায়াতের ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানের সম্মানী আমার পর্যন্ত পৌঁছেনি। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আজ আরেকটি দুঃখজনক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। রায়পুরের গুহা চাইনিজ রেস্তোরাঁয় আজ আয়োজিত বিএনপি প্রার্থীর ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণই জানানো হয়নি। বিষয়টি সত্যিই কষ্ট দিয়েছে।
আমার দাওয়াত পেতেই হবে—এমন কোনো দাবি আমার নেই। তবে দাওয়াত না পাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করার অধিকার একজন সংবাদকর্মীর নিশ্চয়ই থাকে। বিশেষ করে যখন দীর্ঘ সময় ধরে সংশ্লিষ্ট দল নিয়ে নিয়মিত সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে জাতীয় দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায়।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যাদের লেখালেখির হাত শক্ত, পেশাগত সততা রয়েছে, তারাই প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হন। আর ঠিক তার বিপরীতে, কিছু নামধারী সাংবাদিক—যারা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালার সাথেই পরিচিত নন—রাজনৈতিক পরিচয় বা তোষণনির্ভর সুবিধার কারণে বড় পরিচয়ে আবির্ভূত হন। এই বৈপরীত্য কি সমাজের জন্য গৌরব বয়ে আনে?
সাংবাদিকতার ৩৫ বছরের জীবনে মানবজমিন ও জনকণ্ঠ পত্রিকায় দুই যুগেরও বেশি সময় কাজ করে এসেছি। রায়পুর প্রেসক্লাবের বর্তমান সদস্যদের মধ্যে সিনিয়র শংকর মজুমদার ছাড়া আমার আগে সাংবাদিকতায় যুক্ত এমন আর কেউ নেই। জহির ভাই ও হারুন ভাই প্রয়াত হয়েছেন। মিন্টু অভিমান ও অপমান সয়ে ক্লাব ত্যাগ করে উপজেলা প্রেসক্লাব গড়ে তুলেছেন। আতোয়ার মনির ও এবিএম রিপন এখনো জেলায় সমকাল ও প্রথম আলোর সঙ্গে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।
এই সিনিয়রদের শূন্যতা পূরণের নামে একসময় উড়ে এসে জুড়ে বসেন কিছু লেবাসধারী ব্যক্তি, যারা পেশাটিকে কখনোই হৃদয় দিয়ে বুঝতে চাননি। বরং নেতা হওয়ার সুবাদে সমর্থক জোগাড় করে ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন। গঠনতন্ত্র বারবার পরিবর্তন, দল ভারী করার অপচেষ্টা—এসবের সঙ্গে কী কী কর্মকাণ্ড যুক্ত হয়েছে, তা এখানে আলোচনায় আনছি না। একে তো লজ্জানত, তার ওপর আবার নিজের লজ্জা বাড়াতে চাই না।
কারো কারো হাতে বড় বড় সার্টিফিকেট আছে, অথচ লেখার ন্যূনতম যোগ্যতা নেই। রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের পরিচয়ের সুবাদে তারা আজও দাপটের সঙ্গে টিকে আছেন—এটাই বাস্তবতা।
সিনিয়রিটির ক্রমে আমার অবস্থান দুইয়ের ঘরে। আমার লেখা সিনিয়র-জুনিয়র সকলের কাছেই প্রশংসিত হয়েছে—এ কথা অহংকার নয়, সত্যের জায়গা থেকে বলছি। নিজেকে তুলে ধরার প্রয়াস কখনোই গর্বের ছিল না। তবে একজন পুরনো সংবাদকর্মী হিসেবে দায়িত্ববোধ অস্বীকারও করতে পারি না।
ভোটের মাঠে আমার মতো নিঃসঙ্গ ও নিরিহ সাংবাদিক দ্বিতীয়টি আছে কি না, সে প্রশ্নও বারবার সামনে আসে। এর ফলশ্রুতিতে প্রেসক্লাবের ভাবমূর্তি একের পর এক ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালের কমিটির পর থেকে সাংবাদিকদের প্রতি অপমান ও অবহেলার নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
২০২৬ সালে এসে জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিএনপির মতো একটি দলও আমার মতো সিনিয়র সংবাদকর্মীকে ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি—এটি কেবল ব্যক্তিগত কষ্ট নয়, এটি একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। জামায়াতের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অভিজ্ঞতার স্ক্রিনশট এখানে দিলাম আবার।
আমি বিশ্বাস করতে চাই—এগুলো কোনো দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং কিছু অযোগ্য, দলকানা ও অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন নামধারী সাংবাদিকের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডের ফল। তাদের কারণেই প্রকৃত গুণী সাংবাদিক ও লেখকরা আজ নিগৃহীত, লাঞ্ছিত ও অবহেলিত। এই পরিস্থিতির অবসান জরুরি। লেখক ও সাংবাদিক সমাজ অসম্মান মেনে নেওয়ার জন্য নয়। সমাজের স্বার্থেই রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের উচিত এ বিষয়ে উদ্যোগী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়া।
প্রদীপ কুমার রায়
০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
রায়পুর
(“রিপোর্টারের ডায়েরি” শীর্ষক গ্রন্থের পান্ডুলিপি থেকে নেওয়া)