প্রদীপ কুমার রায়, বিশেষ প্রতিনিধি: লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুরের ধানহাটা এলাকার সেই বাসাটি এখন নিস্তব্ধ। একদিন আগেও যেখানে মা ও তিন মেয়ের হাসি-আনন্দে মুখর ছিল ঘর, আজ সেখানে শুধু স্মৃতি আর কান্না। এক ছাদের নিচে থাকা চারজনকে হারিয়ে একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম সিফাত যেন মুহূর্তেই পৃথিবীতে একা হয়ে গেলেন।
শুক্রবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে শাহিনুর বেগম (৩৮), তাঁর বড় মেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থী সায়মা আক্তার (২০), ইকরা আক্তার (১৭) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তারের (৯) মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিকেলে রায়পুর শহরের ধানহাটা এলাকায় জানাজা শেষে তাঁদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার হোমনায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারজনকে দাফন করা হবে।
জানাজার সময় স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর চোখ ছিল অশ্রুসিক্ত। চারটি মরদেহ একসঙ্গে বিদায় দেওয়ার দৃশ্য উপস্থিত অনেককেই বাকরুদ্ধ করে দেয়। মানুষের মুখে ছিল একটাই প্রশ্ন—কী অপরাধ ছিল এই মা আর তাঁর তিন মেয়ের?
এ ঘটনায় নিহত শাহিনুর বেগমের ছেলে সিফাত বাদী হয়ে রায়পুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় নিহত অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারসহ অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, গণপিটুনিতে নিহত অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের মরদেহ এখনো হাসপাতালের হিমঘরে রয়েছে। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তাঁর পরিবারের কেউ মরদেহ নিতে আসেননি।
হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। এলাকায় নানা ধরনের আলোচনা থাকলেও পুলিশ বলছে, সব দিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে নিশ্চিতভাবে কিছু বলার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) আবদুর রাশেদ বলেন, দুটি পৃথক মামলা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। তদন্ত শেষ হলে সবকিছু স্পষ্ট হবে।
ঘটনার পর থেকে রায়পুরজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আতঙ্কে অনেকেই এখনো সেই বাসার সামনে দাঁড়াতে সাহস পান না। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
একটি পরিবারের চারজন মানুষকে হারানোর এই ঘটনা শুধু রায়পুর নয়, পুরো দেশকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি কষ্টের জায়গা হলো, একদিনে মা ও তিন বোনকে হারিয়ে সিফাতকে এখন নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে। যে ঘরে একসময় ছিল পরিবারের হাসি, সেই ঘর আজ শুধুই নীরব।
রায়পুরবাসীর একটাই প্রত্যাশা—এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য দ্রুত বেরিয়ে আসুক। যারা দায়ী, তারা যেন আইনের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়। তাহলেই হয়তো নিহত চারজনের স্বজনদের কিছুটা হলেও সান্ত্বনা মিলবে।