মাহমুদুর রহমান মনজু
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:
লক্ষ্মীপুরের জেলা শহর থেকে শুরু করে চারটি উপজেলা—রামগতি, কমলনগর, রায়পুর ও রামগঞ্জ—সব জায়গার সড়কেই লাইসেন্সবিহীন সিএনজি অটোরিকশার দৌরাত্ম্য দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রয়োজনীয় রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস এবং চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই এসব যানবাহন অবাধে চলাচল করায় চরম সড়কঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন সড়কে দেখা গেছে, সকালে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কর্মজীবী মানুষ সবাই এই অনিয়ন্ত্রিত সিএনজির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চালকদের অধিকাংশই অপ্রশিক্ষিত এবং কাগজপত্রবিহীন। ফলে প্রায়ই ঘটে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, আহত হন নিরীহ যাত্রীরা।
যাত্রীদের অভিযোগ, লাইসেন্সবিহীন সিএনজি চালকরা বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালান। তদারকির অভাব ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় তারা নির্বিঘ্নে সড়কে চলে। অনেক সময় যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, তর্ক-বিতর্ক এবং আচরণগত দুর্ব্যবহারের ঘটনাও ঘটে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, দুর্ঘটনা রোধে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে জরুরি ভিত্তিতে লাইসেন্সবিহীন সিএনজি অটোরিকশা বন্ধ করতে হবে। চালকদের তথ্যভুক্ত করা, নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা এবং নিয়মিত ট্রাফিক অভিযান জোরদার করার দাবি উঠেছে সর্বমহল থেকে।
তারা মনে করেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে লক্ষ্মীপুরের সড়ক আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে, বাড়বে প্রাণহানির ঘটনাও।
লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) জনাব এস.এম মেহেদী হাসান বলেন,
“লাইসেন্সবিহীন যান চলাচল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক সময় চালকদের আইনি সচেতনতা কম এবং মালিকপক্ষও দায়িত্ব এড়িয়ে যায়।”
জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) জনাব আবু তারেক জানান,
“জেলা ও উপজেলায় একাধিক চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। তারপরও কিছু অটোরিকশা চালক বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করে চেক এড়িয়ে চলাচল করে। আমরা অভিযান আরও জোরদার করছি।”
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদের ইউএনও জনাব জামশেদ আলম রানা বলেন,
“লাইসেন্সবিহীন সিএনজি–অটোরিকশা শনাক্ত হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা বা জব্দ করা হচ্ছে। কিছু স্থানে পরিবহন সিন্ডিকেটের চাপও আছে, তবে আমরা তা উপেক্ষা করে আইন প্রয়োগ করছি।”
লক্ষীপুর বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান,
“অনেক মালিক নিয়মিত রেজিস্ট্রেশন বা ফিটনেস করতে আসে না। আবার মালিক–চালকরা অনেক সময় অজুহাত দেখায় যে ফরম পূরণ ও কাগজপত্রের ঝামেলা বেশি। আমরা নিয়মিত সচেতনতা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি।”
জেলা ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) কামরুল হাসান বলেন,
“লক্ষ্মীপুর সদর, রামগঞ্জ, রামগতি, কমলনগর ও রায়পুরে মিলিয়ে প্রতিদিন অন্তত কয়েক হাজার সিএনজি চলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের লাইসেন্স নেই প্রতিটি রুটে কঠোর নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়ে।ট্রাফিক বিভাগের এই কর্মকর্তা জানান মাঝে মাঝে অভিযান চালানো হলেও সড়কে অবৈধ সিএনজি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ সংখ্যায় এদের আধিক্য এবং যথাযথ নিবন্ধন ব্যবস্থা না থাকায় একবার আটক করলেও কিছুদিন পর আবার সড়কে নেমে আসে।
লক্ষ্মীপুর সিএনজি মালিক সমিতির এক নেতা বলেন,
“লাইসেন্স করতে গেলে অনেক সময় ভোগান্তি পোহাতে হয়।সেই কারনে মালিক এবং চালকরা লাইসেন্স করতে চায়না।
সরজমিনে একাধিক সিএনজি চালকে সাথে কথা বলে জানা যায় তারা বলেন ,
“লাইসেন্স করলে একবারে অনেক টাকা লাগে। প্রতিদিনের আয় কম। গাড়ির মালিকরা তাই সব কাগজপত্র করতে চায় না।”
রামগঞ্জের স্কুলশিক্ষিকা শারমিন আক্তার বলেন,
“লাইসেন্সবিহীন সিএনজি খুব দ্রুতগতিতে চলে। দুর্ঘটনার ভয় থাকে। কেউ নজরদারি না করায় চালকরাও ভয় পায় না।”
সদরের ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন বলেন,
“সন্ধ্যার পর সিএনজির বেপরোয়া চলাচল আরও বেড়ে যায়। মাঝে মাঝে যাত্রীদের সাথে দুর্ব্যবহারও করে।”
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক জানান,
“প্রতি মাসেই সিএনজি–সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় আহত রোগী আসে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গাড়ির ব্রেক বা ড্রাইভারের অভিজ্ঞতার অভাব প্রধান কারণ।”
নিরাপদ সড়ক চাই (নিশচা) লক্ষ্মীপুর শাখার একজন প্রতিনিধি বলেন,
“লাইসেন্সবিহীন সিএনজি চলাচল বন্ধে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বিআরটিএকে একসঙ্গে পরিকল্পনা নিতে হবে। নইলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে না।”