ডেস্ক নিউজ:
ড. ফয়জুল হক তার ফেসবুক ভেরিফাইড পেজে লেখেন “লাল দালানের” তেজ দেখতে শুরু করবে সরকার। এ বষয়ে তার লেখাটি পুরোপুরি তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য।
লাল দালানের তেজ দেখতে শুরু করবে সরকার। ২৯ নম্বর মিন্টু রোডের বিরোধীদলীয় নেতার জন্য বরাদ্দকৃত লাল দালান দাঁড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক বহু সাক্ষী নিয়ে।
এই লাল দালানটিতে যতদিন বিরোধী দলের নেতারা ছিলেন, ততদিন এই দালান ছিল শক্তিশালী—যে শক্তি পরবর্তীতে তাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় পর্যন্ত নিয়ে যায়। কিন্তু কালের সাক্ষী এই লাল দালানটিতে ফ্যাসিবাদের আমলে অবস্থান করেনি কোনো বিরোধীদলীয় নেতা।
আসলে তৎকালীন সময়ে সত্যিকার বিরোধীদল বলতেই তো কিছু ছিল না সংসদে। যারা ছিলেন, তারা ছিলেন ভাগ-বাটোয়ারার বিরোধীদলের নেতা। একই পার্টির একই পরিবারের তিনজন সদস্য ছিলেন পরপর—হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ, রওশন এরশাদ ও গোলাম কাদের। প্রাকৃতিকভাবেই এ তিনজনকে বরণ করে নেয়নি লাল দালান। আর সে কারণেই লাল দালানের তেজ দেখেনি গত ১৬ বছরে কেউ।
কিন্তু আজ এই লাল দালানের বাসিন্দা হচ্ছেন জাতীয় সংসদের সর্ববৃহৎ বিরোধীদলের নেতা, জুলাই বিপ্লবের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড, আমীরে জামায়াত ডক্টর শফিকুর রহমান। তিনি ঠিক পূর্ববর্তী সাবেক দুইজন বিরোধীদলীয় নেত্রীর মতোই এই বিল্ডিং থেকেই পথ পাড়ি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছবেন।
আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া—এই দুইজনই সকল আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই ভবন থেকেই।
পূর্ববর্তী দুইজন নেত্রীর চাইতে বর্তমান সময়ের বিরোধীদলীয় নেতা ডক্টর শফিকুর রহমানের মধ্যে কিছু ঐতিহাসিক ভিন্নতা রয়েছে। পূর্ববর্তী দল দুটির নেত্রীদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পারিবারিক সিলসিলা জারি ছিল—একজনের বাবার কাছ থেকে ক্ষমতায় ধাবিত হওয়া, আরেকজন তার স্বামীর সূত্রে ক্ষমতায় আসার ইতিহাস রয়েছে।
কিন্তু এই প্রথম স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদলীয় আসনে বসাতে সক্ষম হয়েছেন আমিরে জামায়াত ডক্টর শফিকুর রহমান।
জনমনে প্রতিষ্ঠিত ধারণা হচ্ছে—এইবারেই জামায়াতে ইসলামী এককভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেত, কিন্তু তাদেরকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিরোধীদলীয় জায়গায় বসানো হয়েছে। অবশ্য তার সত্যতা কয়েকজনের বক্তব্য থেকে ইতিমধ্যে স্পষ্ট হওয়া শুরু হয়েছে।
যেমন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টা মুখ ফসকে বলেই ফেললেন—“আমরা তাদেরকে মেইনস্ট্রিমে যেতে দেইনি।” শেখ হাসিনার একটি অডিও কল ভাইরাল হয়েছে, সেখানেও তিনি ইঙ্গিত করে বলেছেন যে অনেকে হাত-পা ধরেই নাকি তাদের কাছ থেকে কিছু ভোট নিয়ে এমপি হওয়ার চেষ্টা করেছে।
এই দুটি উদাহরণ থেকে স্পষ্ট—জামায়াতে ইসলামীকে মূলত বসতে দেওয়া হয়নি ক্ষমতায়। তবে আমার বিবেচনায় বসতে দিক কিংবা না দিক, জামায়াত এখন ক্লাসের দ্বিতীয় বেঞ্চে বসে আছে। তার জন্য পেছনের সব দরজা বন্ধ, শুধু একটি দরজা খোলা—আর সেটি হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া।
ক্লাসের ফার্স্ট বয়ের নতুন করে অর্জনের কিছুই থাকে না, কিন্তু সেকেন্ড বয়ের ফার্স্ট হওয়ার পথ উন্মুক্ত থাকে। এখন জামায়াত সেই ফার্স্ট হওয়ার পথেই হাঁটছে, সাথে সংযুক্ত হয়েছে সেই ঐতিহাসিক লাল দালানটি।
এ দালানটির তেজ বাংলাদেশের জনগণ একটু ভিন্ন আঙ্গিকে দেখতে পারবে। কারণ বিগত দিনে বাংলাদেশের বিরোধী দলের যত আন্দোলন হয়েছে, সব আন্দোলনের আসল মাস্টারমাইন্ড কিন্তু এই জামায়াতই ছিল।
উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারেন ভাষাসৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের প্রস্তাবকৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফর্মুলা। আওয়ামী লীগ এবং জামায়াত মিলেই সে ফর্মুলা বাস্তবায়ন করে। যে কারণে তৎকালীন সময়ে শেখ হাসিনা অধ্যাপক গোলাম আযমের পা ছুঁয়ে সালাম পর্যন্ত করেছিলেন।
গোলাম আযম সাহেব তখন ছিলেন আমিরে জামায়াত। শেখ হাসিনার ভাষ্যমতে, বর্তমান সময়ে আওয়ামী লীগকেও ক্ষমতা থেকে নামাতে ষড়যন্ত্র করেছে জামায়াত-শিবির। আর সে কারণেই ২০২৪ সালের ১ আগস্ট জামায়াত-শিবিরকে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করেছিলেন শেখ হাসিনা।
জামায়াত যে কী জিনিস, তা যেমন শেখ হাসিনা ভালো করে জানেন, তেমনি জানেন বিএনপির নেতৃবৃন্দও। একসময় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতের এই শক্তিকে শ্রদ্ধা করতেন এবং সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়েই ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন।
বর্তমান সরকারকে মনে রাখতে হবে—যেই জামায়াত-শিবিরের ভয়ে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, এবং বিএনপি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে তিন মাসের কম সময়ের মধ্যে ক্ষমতা হারিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে—সেই জামায়াত-শিবির এখন এই লাল দালানে অবস্থান করছে।
পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়—এই দালান একসময় মহীরূহ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে ডক্টর শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে পারে।
ডক্টর শফিকুর রহমানের নেতৃত্বেও রয়েছে ভিন্নতা। তিনি আত্মবিশ্বাসী, কৌশলী এবং একজন ভিশনারি মানুষ। তিনি বিশ্বাস করেন—জামায়াতে ইসলামীই বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির পথ দেখাতে পারে এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
তার এই দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের কারণেই আজ জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধীদল এবং তিনি এই লাল দালানের বাসিন্দা।
আগামীর রাজনীতিতে এমন কিছু ঘটনা এই লাল দালান থেকে ঘটবে, যা ক্ষমতাসীনদের ধারণার বাইরে থাকতে পারে।
জামায়াত-শিবিরকে দুর্বল ভেবে যেমন শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারিয়েছেন, তেমনি একবার খালেদা জিয়াও—ঠিক তেমনই এবার জামায়াত-শিবিরের কাছেই ধরাশায়ী হতে পারে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।
সাদা দাড়ি, সাদা চুল—দেখতে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মতো—ডক্টর শফিকুর রহমানই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চিফ লিডার ও প্রধানমন্ত্রী হবেন—এমন ধারণা এখন অনেক মহলে প্রচলিত।
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই বাড়িটি কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। মনে হয়, এই বাড়িটিই সাক্ষী হতে চায় জামায়াতের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সেই মুহূর্তটির।
সেই কারণেই হয়তো দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ এই ভবনটি আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। প্রথম দিনেই এখানে প্রায় অর্ধশত রাষ্ট্রদূতের আগমন ঘটেছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ঈদ সাক্ষাৎকার যতটা না প্রচারিত হয়েছে, তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি বিরোধীদলীয় নেতার ঈদ সাক্ষাৎকারটি গ্রাম-গঞ্জে অলিতে-গলিতে পৌঁছে গেছে।
এই ভবনটিতে যাতে আমিরে জামায়াত না ওঠেন, সেজন্য একটি রাজনৈতিক মহল বিভিন্ন কৌশলে ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল। তারা প্রশ্ন তুলেছিল—আমির যদি সরকারি প্লট বা গাড়ি ফ্রি না নেন, তাহলে এই বাড়িতে কেন উঠছেন?

বাস্তবে তিনি বলেছেন—স্থায়ীভাবে প্রাপ্ত প্লট বা ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি তিনি নেবেন না, এবং নেনওনি। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় প্রটোকল, ফেরতযোগ্য গাড়ি, এই লাল দালান, সংসদ ভবনের কক্ষসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা পাবেন—এটাই তার অধিকার।
এই দালানটি তার ব্যক্তিগত বাসা নয়, বরং একটি সরকারি অফিসের মতো।
এই ভবনটির লোকেশন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি স্পর্শকাতর। এখানে সহজে নির্যাতন চালানো সম্ভব নয়। কারণ এই দালান গরম হয়ে উঠলে পুরো মন্ত্রীপাড়া গরম হয়ে যাবে, নড়বড়ে হয়ে যাবে ক্ষমতার মসনদ।
তাই যারা এখনো লাল দালানের তেজ দেখেননি, নতুন প্রজন্ম—তারা অপেক্ষা করুন। সামনের দিনগুলোতে তেজদীপ্ত পরিবর্তনের সাক্ষী হতে পারেন।
আল্লাহ মহান।
ড. ফয়জুল হক