November 7, 2026, 4:02 pm
শিরোনাম:
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ বাংলাদেশির মৃত্যু, আহত ১৫ রায়পুরে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা, শিশুদের প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে গ্রাম পুলিশ মহাসমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর যোগদান ১৭ বছর পর আগামীকাল রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হবে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস লক্ষ্মীপুরে ডিবির অভিযানে ২৫ পিস ইয়াবাসহ যুবক গ্রেপ্তার রায়পুরে ডাকাতিয়া নদীর জোয়ার-ভাটা বন্ধে মাছ বিলুপ্তির পথে, ব্যাহত হচ্ছে জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও মেধাবৃত্তি প্রদান করল আলফা স্টার ফাউন্ডেশন, প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া যুদ্ধবিরতির শর্তে সৌদির কাছে সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি হুথিদের ইউপি নির্বাচন: বিএনপিতে কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধের আহ্বান বেলাল হাওলাদারের লক্ষ্মীপুরে লাইসেন্সবিহীন ৩টি অবৈধ ইটভাটায় উচ্ছেদ অভিযান
নোটিশ :
বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন ০১৬২৪৩০৪৪৪৭ সাংবাদিক নিয়োগ চলছে। যোগাযোগ ০১৭৭৯০৫৫১১১

রায়পুরে ডাকাতিয়া নদীর জোয়ার-ভাটা বন্ধে মাছ বিলুপ্তির পথে, ব্যাহত হচ্ছে জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা

Reporter Name

 

প্রদীপ কুমার রায়, বিশেষ প্রতিনিধি:

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ডাকাতিয়া নদী ও সংযুক্ত খালগুলোর পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ না থাকায় কোথাও পানি বিবর্ণ, কোথাও ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে দুর্গন্ধ এতটাই প্রকট হয় যে নদীপাড়ের মানুষের বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়ে। দূষিত পানির সংস্পর্শে চর্মরোগসহ নানা সমস্যায় পড়ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। একসময় দেশীয় মাছে ভরপুর থাকা নদী ও খালগুলোতে এখন মাছের আকাল। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, চাঁদপুর সেচ প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৮০ ভাগ মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
উপজেলার দেবীপুর গ্রামের নদীপাড়ের বাসিন্দা জসিমউদ্দীন বলেন, আগে নদীর পানি স্বচ্ছ ছিল। নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন পানি কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে গেছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে দুর্গন্ধে ঘরে থাকাও কষ্টকর হয়ে পড়ে। নদীর পাশে বসবাস করেও এখন নদীর পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চললেও স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না।
নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা আব্দুল হক বলেন, একসময় এ নদীতে মাছ ধরে সংসার চালিয়েছেন। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলেও তেমন মাছ পাওয়া যায় না। অনেক জেলে মাছ ধরা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। নদীতে জোয়ার-ভাটা না থাকায় পানি নষ্ট হচ্ছে, মাছও কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে তাঁদের মতো জেলেদের পেশা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় ডাকাতিয়া নদী ও এর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলো ছিল দেশীয় মাছের ভান্ডার। রুই, কাতলা, মৃগেল, আইড়, কালিবাউশ ও বোয়ালসহ প্রায় ১০০ প্রজাতির ছোট-বড় মাছ পাওয়া যেত। নদী ও খালে জাল, বড়শি, টেঁটা ও আনতা দিয়ে মাছ ধরে অনেক পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। এখন মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় জেলেদের পেশা বদলাতে হচ্ছে। স্থানীয় বাজারেও দেশীয় মাছের সরবরাহ কমেছে।
নদীর দূষিত পানির প্রভাব পড়েছে গৃহস্থালির কাজেও। গৃহবধূ লিপিকা হাওলাদার বলেন, নদীর পানি দিয়ে নিয়মিত গোসল করা, থালাবাসন ধোয়া ও সংসারের বিভিন্ন কাজ করতে হয়। কিন্তু পানিতে এখন দুর্গন্ধ, অনেক সময় রংও পরিবর্তন হয়ে যায়। এ পানি ব্যবহার করতে ভয় লাগে। পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। নদীর পানি আগের মতো পরিষ্কার না হলে তাঁদের মতো সাধারণ পরিবারের ভোগান্তি কমবে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সংকটের অন্যতম কারণ চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের পানি ব্যবস্থাপনা। ১৯৭৫ সালে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রায়পুর, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর সদর (আংশিক), ফরিদগঞ্জ, হাইমচর ও চাঁদপুর সদর (আংশিক) উপজেলা নিয়ে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় রায়পুরের ডাকাতিয়া নদীর হাজীমারা স্লুইস গেট এবং চাঁদপুরের চরবাগাদী নেভিগেশন গেটের মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব গেট দিয়ে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার পানিপ্রবাহ চালু না থাকায় নদী ও খালগুলোতে পানির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চাঁদপুর সেচ প্রকল্প এলাকায় ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাকাতিয়া নদী ও ৭৫৬ কিলোমিটার খাল রয়েছে। প্রতি বছর নভেম্বরের শেষ দিকে চরবাগাদী পাম্প হাউসের নিচের অংশে যান্ত্রিক মেরামতের সুবিধার্থে প্রকল্প এলাকার অধিকাংশ পানি বের করে দেওয়া হয়। এতে অনেক খাল পানিশূন্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় পানি স্থির থাকায় দূষণ ও দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়।
এ পরিস্থিতিতে রায়পুরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। নদী ও খালের পানি ব্যবহার, মাছ ধরা এবং কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। খালে পানির স্বল্পতায় সেচ সুবিধা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীপাড়ের জনবসতিতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় শিশু, বৃদ্ধসহ সব বয়সী মানুষকে অস্বস্তিকর পরিবেশে থাকতে হচ্ছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন জানান, স্লুইস গেট বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় স্থির হয়ে থাকা পানি দূষিত হচ্ছে এবং পরিবেশ দুর্গন্ধময় হয়ে উঠছে। পানি সংকট ও দূষণের কারণে প্রকল্প এলাকার প্রায় ৮০ ভাগ মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এতে দেশের অন্যতম মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র রায়পুর মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রে রেণু ও পোনা উৎপাদনসহ নদী, খাল ও পুকুরে মাছের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, মৎস্য ও পরিবেশের স্বার্থ বিবেচনায় স্লুইস গেট দিয়ে পরিকল্পিতভাবে জোয়ার-ভাটার পানিপ্রবাহ চালু রাখা হলে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়বে এবং পানিদূষণও কমে যাবে।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আজিজুন্নাহার বলেন, নদী ও খালের পানিদূষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ড, মৎস্য বিভাগ ও অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সমস্যার কারণ এবং প্রতিকার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, হাজীমারা ও চরবাগাদী গেটের পানি ব্যবস্থাপনা পুনর্মূল্যায়ন করে পরিকল্পিতভাবে জোয়ার-ভাটার পানিপ্রবাহ চালু করতে হবে। পাশাপাশি নদী ও খালের পানি নিয়মিত পরীক্ষা, দূষণের উৎস শনাক্ত এবং মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাঁদের প্রশ্ন, যে নদী একসময় মানুষের জীবিকা জুগিয়েছে, সেই নদীর দূষিত পানির দুর্গন্ধ আর কত দিন সহ্য করতে হবে?.


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা